শবে বরাতের রোজা রাখার নিয়ত এবং সঠিক দোয়া ও আমল

শবে বরাত এমন একটি রাত, যেদিন একজন মুমিন নিজের জীবনের ভুলগুলো নতুন করে ভাবার সুযোগ পায়। সারাবছরের ব্যস্ততা, দুনিয়ার দৌড়ঝাঁপ আর নানা ভুলের মাঝে আমরা অনেক সময় আল্লাহকে ভুলে যাই। ঠিক তখনই শবে বরাত আমাদের জন্য আসে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে। এই পবিত্র রাতের পরদিন রোজা রাখা অনেক মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধির একটি সুন্দর মাধ্যম। শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তেই এই রোজার মূল উদ্দেশ্য।

অনেকেই জানতে চান—শবে বরাতে রোজা রাখার নিয়ত কীভাবে করবেন, কোন দোয়াটি পড়বেন, কখন নিয়ত করা উত্তম এবং এই রোজার প্রকৃত ফজিলত কী। এই পোস্টে আমরা খুব সহজ ভাষায়, বাস্তব জীবনের সাথে মিল রেখে, ধাপে ধাপে সব বিষয় তুলে ধরেছি, যেন আপনি পড়েই সরাসরি আমল করতে পারেন।

আরো পড়ুন:- শবে বরাতের রোজা কি সুন্নত ? হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ ও বাস্তব সত্য

শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখার গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। অনেক হাদিসে এসেছে—তিনি শাবান মাসে অধিকাংশ দিন রোজা রাখতেন।

শবে বরাতের পরদিন অর্থাৎ ১৫ শাবান রোজা রাখা নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তবে সওয়াবের আশায় রাখা উত্তম আমল।

👉 মনে রাখবেন, শবে বরাতের রোজা আলাদা কোনো ফরজ নয়। এটি নফল রোজা হিসেবে পালন করা হয়।

শবে বরাতে রোজা রাখার নিয়ত

(আরবি)

নিয়ত মূলত মনের ইচ্ছা ও সংকল্প। তবুও সহজ বোঝার জন্য নিচে নিয়তের দোয়া দেওয়া হলো—

نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا مِنْ شَهْرِ شَعْبَانَ نَفْلًا لِلّٰهِ تَعَالَى

(বাংলা উচ্চারণ)

নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি শাবানা নাফলান লিল্লাহি তাআলা।

(বাংলা অর্থ)

আমি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল শাবান মাসের নফল রোজা রাখার নিয়ত করলাম।

শবে বরাতের রোজা রাখার নিয়ত এইভাবে সহজ ভাষায় করতে পারেন।

নিয়ত কখন করবেন

নফল রোজার ক্ষেত্রে নিয়তের সময় একটু সহজ। আপনি চাইলে,

  • রাতে সাহরির সময় নিয়ত করতে পারেন।
  • ঘুম থেকে উঠে ফজরের আগে নিয়ত করতে পারেন।
  • এমনকি সূর্য ঢলার আগ পর্যন্ত (যদি কিছু না খেয়ে থাকেন) নিয়ত করা যায়।

✅তবে উত্তম হলো, রাতে বা সাহরির সময় নিয়ত করা

মুখে নিয়ত করা কি জরুরি

অনেকেই প্রশ্ন করেন, মুখে দোয়া না পড়লে কি রোজা হবে না?

👉 ইসলামি শরিয়তে নিয়ত মানে হলো অন্তরের সংকল্প। মুখে বলা সুন্নত ও সহায়ক, ফরজ নয়।

অর্থাৎ, আপনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেই নিয়ত হয়ে যায়। তবে মুখে বললে মনোযোগ ও ইবাদতের অনুভূতি বাড়ে।

শবে বরাতের রোজার ফজিলত

শবে বরাতের রোজার বিশেষ কিছু ফজিলত রয়েছে যেমন,

গুনাহ মাফের সুযোগ

এই দিনের রোজা বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। তওবা ও ইবাদতের মাধ্যমে গুনাহ মাফের সুযোগ তৈরি হয়।

নফল ইবাদতের সওয়াব

নফল রোজার প্রতিটি আমলে আল্লাহ অতিরিক্ত সওয়াব দান করেন।

রমজানের প্রস্তুতি

শাবান মাসে রোজা রাখলে শরীর ও মন রমজানের জন্য প্রস্তুত হয়।

সুন্নতের অনুসরণ

রাসুল (সা.) শাবান মাসে বেশি রোজা রাখতেন। এই আমল সেই সুন্নতের অনুসরণ।

শবে বরাতের রাতে আমল

শুধু রোজা নয়, শবে বরাতের রাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে—

নফল নামাজ

২ রাকাত করে বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করুন। নিজের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করুন।

কোরআন তিলাওয়াত

এই রাতে কোরআন পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

ইস্তিগফার ও দরুদ

বেশি বেশি “আস্তাগফিরুল্লাহ” ও দরুদ শরিফ পড়ুন।

দোয়া

নিজের, পরিবারের ও উম্মাহর জন্য দোয়া করুন।

রোজার দিন করণীয়

রোজা রাখার পাশাপাশি—

  • মিথ্যা, গিবত ও ঝগড়া থেকে দূরে থাকুন।
  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ার চেষ্টা করুন।
  • কোরআন পড়ুন।
  • গরিবদের সাহায্য করুন।

রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়। এটি আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ।

অনেকেই কিছু ভুল করেন

  • শবে বরাতকে ফরজ মনে করা।
  • আতশবাজি ও অপচয় করা।
  • কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া।

ইবাদত হবে কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী।

শবে বরাতের রোজা কি বাধ্যতামূলক

না। এটি ফরজ নয়। এটি নফল ইবাদত। কেউ রাখলে সওয়াব পাবেন, না রাখলেও গুনাহ হবে না।

শবে বরাতের রোজা রাখার নিয়ম

  • শুধু ১৫ শাবান।
  • ১৪ ও ১৫ শাবান।
  • ১৩, ১৪, ১৫ (আইয়ামে বিজ)।

এই তিনদিন রোজা রাখতে পারেন। এতে সওয়াব আরও বাড়ে।

কিছু টিপস

  • সাহরিতে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খান।
  • পানি বেশি পান করুন।
  • বেশি ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন।
  • ইফতারে সহজ খাবার খান।

উপসংহার

শবে বরাতে রোজা রাখা একটি সুন্দর নফল ইবাদত, যা আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত পাওয়ার একটি বড় সুযোগ। সঠিক নিয়ত, খাঁটি অন্তর এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করলে এই রোজা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।

এই শবে বরাতে আমরা সবাই যেন গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর দিকে ফিরে যাই—এই দোয়াই করি।

প্রশ্ন ও উওর

শবে বরাতের রোজা কি ফরজ?

না, এটি ফরজ নয়। এটি নফল রোজা।

নিয়ত মুখে না বললে কি রোজা হবে?

হবে। নিয়ত মূলত অন্তরের সিদ্ধান্ত।

সাহরি না খেলে রোজা হবে?

নিয়ত থাকলে রোজা হবে, তবে সাহরি খাওয়া সুন্নত।

নারী হায়েজ অবস্থায় শবে বরাতে রোজা রাখার নিয়ত রাখতে পারবে?

না, সে সময় রোজা রাখা যাবে না।

শবে বরাতের রাতে ঘুমালে কি গুনাহ?

না। তবে ইবাদত করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

📌ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার সোশ্যাল বাড়ে😊

Leave a Comment