রোজার নিয়ত: আরবি ও বাংলা উচ্চারণ সহ কখন করা উঠিত

রমজান আসলেই আমাদের মনে একটা আলাদা প্রশান্তি তৈরি হয়। সাহরির সময় ঘুম থেকে উঠা, আজানের ধ্বনি, পরিবারের সবাই একসাথে বসা এই অনুভূতিগুলো শুধু খাবারের জন্য নয়, বরং ইবাদতের প্রস্তুতি। আর সেই ইবাদতের শুরুই হয় একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়ে নিয়ত।
অনেকেই ভাবেন, রোজার নিয়ত মানে একটি নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ করে পড়তে হবে। কেউ বলেন না পড়লে রোজা হবে না। কেউ আবার সন্দেহে থাকেন “আমি কি ঠিকভাবে নিয়ত করতে পারলাম?”
আজ আমরা সব বিভ্রান্তি দূর করে পরিষ্কারভাবে জানবো রোজার নিয়ত আসলে কি, কিভাবে করতে হয়, আর কোন বিষয়গুলো জানলে আপনার রোজা হবে সহিহ ও গ্রহণযোগ্য।

নিয়ত মানে কি


নিয়ত মানে মুখের কথা নয় মনের ইচ্ছা।
আপনি যদি রাতে ঘুমানোর আগে ঠিক করেন, “আগামীকাল আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখবো” তাহলেই নিয়ত হয়ে গেছে। আর আলাদা করে আরবিতে রোজা রাখতে হবে তার নিয়ত করা লাগে না।
হাদিসে এসেছে, প্রতিটি কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ আল্লাহ আপনার হৃদয়ের ইচ্ছা দেখেন, শব্দ নয়।
👉 তাই যারা আরবি জানেন না, তারা চিন্তা করবেন না।
👉 যারা দোয়া ভুলে যান, তাদের রোজাও বৈধ।

আরো পড়ুন:- প্রথম রোজা কতো তারিখ : ২০২৬ সালের রমজান কবে জানুন


রোজার নিয়ত


যদিও মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়, তবুও অনেকেই শেখার সুবিধার জন্য দোয়া জানতে চান।


রোজার নিয়ত আরবি


نَوَيْتُ أَنْ أَصُوْمَ غَدًا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ لِلّٰهِ تَعَالَى


রোজার নিয়ত বাংলা


নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদানা লিল্লাহি তা’আলা।


রোজার নিয়ত অর্থ


আমি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল রমজান মাসের রোজা রাখার নিয়ত করলাম।
আবার বলছি এই দোয়া না পড়লেও সমস্যা নেই, যদি অন্তরে নিয়ত থাকে।


সঠিক সময় নিয়ত করুন



✔ ফজরের আগে নিয়ত থাকতে হবে।
✔ সাহরি খেলে নিয়ত হয়ে যায়।
✔ শুধু মনে ইচ্ছা থাকলেও যথেষ্ট।


যদি কেউ গভীর ঘুমে থাকে কিন্তু রাতে ঠিক করেছিল রোজা রাখবে—তাহলেও রোজা হবে।


সাহরি না খেলে কি রোজা হবে


হ্যাঁ, হবে।
সাহরি সুন্নত এবং বরকতময়। কিন্তু সাহরি না খেলেও যদি নিয়ত থাকে, রোজা বৈধ।
তবে সাহরি না খেলে শরীর দুর্বল হতে পারে তাই চেষ্টা করবেন অল্প হলেও কিছু খেতে।


কাজা ও নফল রোজার নিয়ত


রমজান ছাড়া অন্য রোজার নিয়ত একটু আলাদা হতে পারে।


✔ কাজা রোজা: নির্দিষ্ট করে মনে করতে হবে যে এটি কাজা।
✔ নফল রোজা: দিনের বেলা সূর্য ঢলে যাওয়ার আগে নিয়ত করা যায় (যদি কিছু খাওয়া না হয়)।


মহিলাদের মাসিক সময় রোজার নিয়ম


যদি কোনো নারী ফজরের আগে পবিত্র হয়ে যান (মাসিক শেষ হয়), তাহলে নিয়ত করলে রোজা রাখতে পারবেন ইভেন যদি গোসল পরে করেন।
কিন্তু মাসিক শুরু হলে রোজা ভেঙে যাবে এবং পরে কাজা করতে হবে।


রোজার নিয়ত না করলে


অনেকে দুশ্চিন্তা করেন “আমি কি দোয়া ঠিকভাবে বললাম?”
মনে রাখবেন, নিয়ত মুখস্থ দোয়া নয়। নিয়ত হলো আপনার উদ্দেশ্য। তাই দোয়া ভুল পড়লেও রোজা শুদ্ধ থাকবে। নিয়তের সাথে রোজার কোনো সম্পর্ক নাই যে আপনাকে আরবি তে নিয়ত করাই লাগবে। আপনি মনে মনে যে ভাব প্রকাশ করেন তাই নিয়ত হয়ে যায়। (তবে আরবিতে পারলে ভালো, কারন আরবিতে করলে সাওয়াব হবে,)


রোজা রেখে যা থেকে বিরত থাকা

রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়। বরং আপনাকে রোজা রেখে এইসব কাজ করা যাবে না, না হলে রোজা ভেঙ্গে যেতে পারে, যেমন

✔ মিথ্যা থেকে বিরত থাকা।

✔ গিবত না করা।

✔ খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা।

✔ নামাজ কায়েম করা।

✔️অন্যর হক না মারা।


যদি কেউ সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকে কিন্তু আচরণ ঠিক না রাখে, তাহলে রোজার মূল শিক্ষা অর্জিত হয় না। ফলে সওয়াব হওয়ার চেয়ে তার গুনা করাই হলো।


রোজার দোয়া না পড়লে কি ঘটবে


ধরুন আপনি সাহরিতে উঠলেন, খাবার খেলেন, পানি খেলেন, মনে মনে ভাবলেন আজ রোজা রাখবো।কিন্তুু আপনি ভুলে কোনো দোয়া পড়লেন না।
এই অবস্থায় আপনার রোজা সম্পূর্ণ সহিহ। রোজা হবে না এটা সম্পন্ন ভুল। কারন
আল্লাহ তায়ালা আপনার আন্তরিকতা দেখেন, উচ্চারণ নয়। তাই এইসব নিয়ে মাতামতি না করাই ভালো।


রোজা আমাদের শিক্ষায়

  • ধৈর্য।
  • আত্মসংযম।
  • কৃতজ্ঞতা।
  • দরিদ্রের কষ্ট অনুভব।
  • এটি শুধু একটি ইবাদত নয়। একটি চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া।

আমাদের কমন কিছু ভুলধারনা


নিয়ত আরবিতে না বললে রোজা হবে না।
সাহরি না খেলে রোজা হবে না।
মুখে না বললে নিয়ত রোজা হবে না।

আসলে আমরা হরাহর এইসব কমন ভুল গুলোর সাথে রোজা আসলেই জড়িত থাকি যে আমরা সেহরি না খেলে রোজা হবে না, আরে সেহরির সাথে রোজার কোনো সম্পর্ক আছে কি রোজা হলো ফরজ আর সেহরি হলো সুন্নত। আবার আরবি নিয়ত না করলে রোজা হবে না ভুল, সবাই তো আর আরবি জানেন না তাহলে কি তাদের রোজা হবে না হবে। আপনি মনে মনে রোজা রাখবেন বললেই রোজার নিয়ত হয়ে যায় এতে কোনো সন্দেহ নাই।

তাই আমরা সবাই ভুলগুলো শোধরাই সামনে অগ্রসর হই। এইসব নিয়ে মাতামাতি না করি।

উপসংহার


রোজার নিয়ত কোনো জটিল দোয়া নয়, এটি আপনার হৃদয়ের একটি সিদ্ধান্ত। আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আন্তরিকভাবে রোজা রাখার ইচ্ছা করেন, তাহলেই নিয়ত পূর্ণ হয়ে যায়। আরবি দোয়া জানা ভালো, উচ্চারণ শেখা ভালো কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের খাঁটি নিয়ত ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা।
রমজান আমাদের শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা শেখায় না এটি আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, চরিত্রকে সুন্দর করে এবং আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে। তাই নিয়ত নিয়ে অযথা সন্দেহ বা ভয় নয় বরং আত্মবিশ্বাস ও ঈমানের দৃঢ়তা নিয়ে রোজা পালন করুন।
মনে রাখবেন, আল্লাহ ভাষার সৌন্দর্য নয় হৃদয়ের সততা দেখেন। যে আপনার মনের ভাব কতো সুন্দ
। আপনার প্রতিটি রোজা হোক কবুল, প্রতিটি দোয়া হোক মঞ্জুর, এবং এই রমজান হোক জীবনের পরিবর্তনের এক নতুন সূচনা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহভাবে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

প্রশ্ন ও উওর


প্রতিদিন আলাদা করে নিয়ত করতে হবে?


হ্যাঁ, প্রতিটি রোজা জন্য আলাদা আলাদা নিয়ত করা লাগবে।


একবার নিয়ত করলে পুরো মাসের জন্য হবে?


না, প্রতিদিন অন্তরে নিয়ত থাকতে হবে।


ঘুমের মধ্যে ফজর নামাজ এর আযান দিয়ে দিলে কি করবো?


রাতে যদি রোজা রাখার নিয়ত থাকে তাহলে অবশ্যই রোজা হবে।


নফল রোজায় দুপুরে নিয়ত করা যাবে?


হ্যাঁ, যদি কিছু না খাওয়া হয়। তখন আপনি নিয়ত করতে পারবেন।


অসুস্থ থাকলে কি ইসলামে রোজা রাখতে হবে বলছে?


না, ইসলাম এতো বাধ্য করে নাই। যে অসুস্থ অবস্থায় রোজা রাখতে হবে। আপনি এখন না রাখতে পারলে পরে কাজা করতে পারবেন।


রোজা রেখে কোনো সন্দেহ হলে কি করবেন?


আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। অযথা সন্দেহ করবেন না।


শিশুদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা যাবে?


বাধ্যতামূলক নয়, তবে ছোটো থেকে অভ্যাস করানো ভালো।

আরো পড়ুন:- আজ থেকে শুরু হলো বিকাশ, রকেট ও নগদ ১ হাজার টাকার লেনদেন বন্ধ

📌ধন্যবাদ সবাইকে এতোক্ষণ ধরে আমাদের এই সম্পন্ন পোষ্টটি পড়ার জন্য😊 দোয়া করি আল্লাহ আপনার জীবনকে আলো, শান্তি ও সফলতায় ভরে দিন — আমিন। আমাদের এই পোষ্টে লেখা জনিত কোনো ভুল বা সমস্যা পেয়ে থাকলে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করছি। ভালো থাকবেন আল্লাহ হাফেজ। আমার কথা হচ্ছে নতুন কোন পোষ্টে, নতুন কোনো টপিক নিয়ে ইনশাআল্লাহ🥰

📌ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার সোশ্যাল বাড়ে😊

Leave a Comment