শাবান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত বরকতময় একটি মাস। এই মাসটি মূলত রমজানের প্রস্তুতির মাস হিসেবে পরিচিত। ঠিক যেমন পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির সময় থাকে, তেমনি রমজানের আগমনের আগে আল্লাহ তায়ালা আমাদের শাবান মাস দিয়েছেন আত্মশুদ্ধি ও আমলের জন্য।
শাবান মাস শুধু একটি সাধারণ মাস নয়। যারা এই মাসে রোজা রাখে, আল্লাহ তাদের হৃদয়কে ধীরে ধীরে রমজানের জন্য তৈরি করে দেন। বাস্তবে দেখা যায় শাবানে যারা নিয়মিত রোজা রাখে, তাদের রমজান অনেক সহজ হয়ে যায়। ইবাদতে মন বসে, অলসতা কমে এবং নামাজ-রোজায় আলাদা এক প্রশান্তি আসে।
এই কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা) এই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং বেশি বেশি রোজা রাখতেন।
আজ আমরা জানবো
শাবান মাসে রোজা রাখার গুরুত্ব, ফজিলত, রাসুল (সা) এর আমল, কোরআন ও হাদিসের দলিল, করণীয় আমল এবং আমাদের বাস্তব জীবনে এর প্রভাব।
আরো পড়ুন:- শবে বরাতের রোজা কি সুন্নত ? হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ ও বাস্তব সত্য
শাবান মাসের রোজার নিয়ত ও দোয়া
আরবি দোয়া
نَوَيْتُ أَنْ أَصُوْمَ غَدًا لِلّٰهِ تَعَالٰى مِنْ نَفْلِ شَعْبَانَ
বাংলা উচ্চারণ
নাওয়াইতু আন আসূমা গাদান লিল্লাহি তা’আলা মিন নাফলি শা‘বান।
অর্থ
আমি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল শাবান মাসের নফল রোজা রাখার নিয়ত করলাম।
মনে রাখবেন, নিয়ত মুখে বলতেই হবে এমন নয়। হৃদয়ে নিয়ত করলেই যথেষ্ট।
ইফতারের সময়ের দোয়া
আরবি দোয়া
اللّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজক্বিকা আফতারতু।
অর্থ
হে আল্লাহ! তোমার জন্যই আমি রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করলাম।
এই দোয়া মন থেকে পড়লে ইফতারের সময় আলাদা এক আত্মিক শান্তি পাওয়া যায়।
শাবান মাস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
শাবান হলো হিজরি বর্ষের অষ্টম মাস। এটি রজব ও রমজানের মাঝখানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
অনেক মানুষ এই মাসকে অবহেলা করে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা) এই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
হাদিসে এসেছে
“এটি এমন একটি মাস, যাকে মানুষ অবহেলা করে। অথচ এই মাসেই বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।” (নাসায়ী, হাদিস: ২৩৫৭)
অর্থাৎ শাবান মাস হলো আমল আল্লাহর কাছে উঠানোর মাস। আর এই সময়ে রোজা রাখলে তার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
আরো পড়ুন:- শবে বরাতের রোজা রাখার নিয়ত এবং সঠিক দোয়া ও আমল
রাসুল (সা) শাবান মাসে কেন বেশি রোজা রাখতেন
আয়েশা (রা.) বলেন
“আমি রাসুল (সা) কে শাবান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে এত বেশি নফল রোজা রাখতে দেখিনি।”
(বুখারি: ১৯৬৯, মুসলিম: ১১৫৬)
এর মানে হলো
রাসুল (সা) শাবান মাসে নিয়মিত রোজা রাখতেন। তিনি চাইতেন এই মাসেই নিজেকে রমজানের জন্য প্রস্তুত করতে।
আমরাও যদি সুন্নাহ অনুসরণ করতে চাই, তাহলে শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা উচিত।
শাবান মাসে রোজা রাখার ফজিলত
আমল আল্লাহর কাছে উত্তোলনের সময় রোজা অবস্থায় থাকা
হাদিসে বলা হয়েছে—
“আমি পছন্দ করি যখন আমার আমল আল্লাহর কাছে উঠানো হয়, তখন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।”
— (নাসায়ী)
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রোজা অবস্থায় আমল আল্লাহর দরবারে পেশ হলে তার মর্যাদা অনেক বেশি হয়।
শাবান মাসে রোজা রাখা ফল
শাবান মাস হলো রমজানের ওয়ার্ম-আপ মাস। এই মাসে রোজা রাখলে
- শরীর রোজার সাথে অভ্যস্ত হয়।
- ইবাদতের মনোভাব তৈরি হয়।
- নফস দুর্বল হয়।
- গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
- ফলে রমজান শুরু হলে কষ্ট কম লাগে।
শাবান মাসে রোজা রাখলে
রোজা শুধু না খাওয়ার নাম নয়। এটি আত্মার ট্রেনিংও বটে। যেমন রোজা রাখলে
- অহংকার কমে।
- ধৈর্য বাড়ে।
- লোভ কমে।
- তাকওয়া তৈরি হয়।
আল্লাহ বলেন
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।”
— (সূরা বাকারা: ১৮৩)
গুনাহ মাফের বড় সুযোগ
শাবান মাসে বেশি ইবাদত করলে আল্লাহ বান্দার দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন।
অনেক আলেম বলেন, এই মাসে ইস্তিগফার ও রোজা একসাথে করলে গুনাহ মাফের দরজা খুলে যায়।
শাবান মাসে কীভাবে রোজা রাখা উত্তম
নিয়ত ঠিক করুন
রোজা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রাখুন। লোক দেখানো বা অভ্যাসের জন্য নয়।
মনে মনে বলুন, “হে আল্লাহ, তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমি শাবান মাসে নফল রোজা রাখছি।”
নিয়মিত সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার চেষ্টা করুন
রাসুল (সা) সপ্তাহে এই দুই দিন রোজা রাখতেন।
এই দিনগুলোতে আমল আল্লাহর দরবারে পেশ হয়।
মাঝামাঝি মাসে বেশি রোজা রাখার চেষ্টা করুন
১৫ তারিখের পরও রাখা যায়, তবে রমজানের ঠিক আগে একদিন বা দুইদিন আগে ইচ্ছাকৃত রোজা রাখা থেকে বিরত থাকাই উত্তম (যদি অভ্যাস না থাকে)।
রোজার রাখার পাশাপাশি ইবাদত বাড়ান
শুধু রোজা রাখাই নয়, সাথে রাখুন যেমন,
- কোরআন তিলাওয়াত।
- দরুদ শরীফ।
- ইস্তিগফার।
- নফল নামাজ।
- দান সদকা।
শাবান মাসে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল
- বেশি বেশি দরুদ পড়া।
- তওবা করা।
- সম্পর্ক ঠিক করা।
- মানুষের হক আদায়।
- গিবত থেকে দূরে থাকা।
কারণ রমজানে ঢোকার আগে মন পরিষ্কার করা জরুরি।
শাবান মাস আমাদের জীবনে কী শিক্ষা দেয়
- হঠাৎ পরিবর্তন নয়, ধীরে ধীরে উন্নতি।
- রমজানের আগে প্রস্তুতি।
- আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
- আত্মসংযমের চর্চা।
অনেক মানুষ রমজান এলেই ইবাদত শুরু করে। কিন্তু যারা শাবানে প্রস্তুতি নেয়, তাদের রমজান হয় অনেক সুন্দর ও বরকতময়।
শাবান মাসে রোজার গুরুত্ব বেশি কেন
এখনাকার যুগে আমরা যেসব জায়গায় নিজের সময় অপচয় করি,
- মোবাইলে আসক্ত।
- গুনাহ করা।
- সময় নষ্ট বেশি অকারনে।
এই অবস্থায় শাবান মাসে রোজা আমাদের নিয়ন্ত্রণ শেখায়। রোজা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়। আমি শুধু দুনিয়ার জন্য না, আখিরাতের জন্যও তৈরি হচ্ছি।
শাবান মাসে রোজা রেখে লাভ কি
- আল্লাহর নৈকট্য।
- গুনাহ মাফ।
- হৃদয়ের শান্তি।
- রমজানে সহজ ইবাদত।
- তাকওয়া বৃদ্ধি।
- আত্মিক শক্তি।
এই লাভ দুনিয়ার কোনো সম্পদের সাথে তুলনা করা যায় না।
রোজা রাখার অবস্থায় যে ভুলগুলো করা যাবে না
অনেকে ভালো কাজ করতে গিয়ে কিছু ভুল করে বসে। আপনি যেন সেগুলো না করেন, তাই আগে থেকেই জেনে নিন।
- শুধু মানুষকে দেখানোর জন্য রোজা রাখা।
- রোজা রেখে নামাজে গাফিল হওয়া।
- গিবত, মিথ্যা ও ঝগড়া করা।
- সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট করা।
- রমজানের আগের দিন জোর করে আলাদা নিয়তে রোজা রাখা।
রোজা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন চরিত্র ও আমল দুইটাই সুন্দর হয়।
উপসংহার
শাবান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহার। এটি আমাদের রমজানের জন্য তৈরি হওয়ার সুযোগ।
যারা এই মাসকে গুরুত্ব দেয়, তারা রমজানে ইবাদতের স্বাদ পায়।
আজই নিয়ত করুন, এই শাবান মাসে অন্তত কিছু রোজা রাখবেন, নিজের জীবন পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাবেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শাবান মাসের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন ও উত্তর
শাবান মাসে কয়টা রোজা রাখা সুন্নত?
নিদিষ্ট সংখ্যা নেই। রাসুল (সা) অধিকাংশ দিন রোজা রাখতেন।
শাবান মাসের ১৫ তারিখ পর রোজা রাখা যাবে?
হ্যাঁ, যদি অভ্যাস থাকে। তবে রমজানের একদিন আগে আলাদা নিয়তে রোজা না রাখাই উত্তম।
শাবান মাসে রোজা ফরজ নাকি নফল?
নফল রোজা। তবে ফজিলত অনেক বেশি।
শাবান মাসে শুধু রোজাই কি যথেষ্ট?
না। সাথে নামাজ, কোরআন, তওবা ও চরিত্র সংশোধন জরুরি।
শাবান মাসে একটানা রোজা রাখা যাবে?
হ্যাঁ, যদি শরীর সক্ষম থাকে এবং রমজানের একদিন আগে আলাদা নিয়তে না হয়, তাহলে একটানা রোজা রাখা জায়েজ।
নারীরা কি শাবান মাসে নফল রোজা রাখতে পারবে?
অবশ্যই পারবে। তবে সংসারের দায়িত্ব ও স্বামীর অধিকার ঠিক রেখে রোজা রাখা উত্তম।
কাজের ব্যস্ততার মাঝেও কি শাবান মাসে রোজা রাখা যাবে?
হ্যাঁ। বরং এতে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা আরও বাড়ে।
নফল রোজার নিয়ত কখন করতে হবে?
ফজরের আগে নিয়ত করা উত্তম। তবে যদি কিছু না খাওয়া হয়, তাহলে সকালেও নিয়ত করা যায়।
শাবান মাসে রোজা রাখলে কি রমজান সহজ হয়?
হ্যাঁ। যারা শাবানে রোজা রাখে, তারা রমজানে কম কষ্ট অনুভব করে এবং ইবাদতে মন বসে।
